দ্বিতীয় দিনের মত জেলার ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্য প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এখন মাঠে বোরো মৌসুমে কাজ। শীতের কারণে কৃষকরা কৃষকরাও মাঠে কাজে যেতে পারছেন না বা দেরিতে মাঠে যাচ্ছেন।
শীতজনিত রোগবালাইও বেড়েছে। প্রতিদিনই শীতজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষ আসছেন হাসপাতালে।
সদর উপজেলার ভুলটিয়া গ্রামের ব্যবসায়ী নুরুজ্জামান বলেন, “কদিন ধরে হঠাৎ করেই শীত জেঁকে বসেছে। আমরা ব্যবসা বাণিজ্য করতে পারছি না। বেচাকেনা কমে গেছে।”
লালমনিরহাট: পৌষের শেষে হাড় কাঁপানো কনকনে ঠান্ডা আর ঘন কুয়াশায় লালমনিরহাটের মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। বিশেষ করে নদী চরাঞ্চল এবং তীরবর্তী লোকালয়ের মানুষ ঠান্ডার প্রকোপে স্থবির হয়ে পড়েছে।
রংপুর আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা মোস্তাফিজার রহমান বলেন, শনিবার সকাল ৮টায় লালমনিরহাটের তাপমাত্রা ১০ দশমিক ৫ ডিগি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে।
গত ৪ দিন ধরে সূর্যের দেখা না মেলায় তীব্র শীতে ভোগান্তি বেড়েছে জনজীবনে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে ঘন কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে রাস্তা-ঘাট ও লোকালয়। সেই সঙ্গে হিমেল বাতাসে জবুথবু অবস্থা বিরাজ করছে মানুষের।
কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে নিম্ন আয়ের লোকজনের। রাতে বৃষ্টির মত ঝরছে কুয়াশা। হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় দুর্ভোগে পড়েছে বয়স্ক ও শিশুরা।
জেলার আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা তিস্তা পাড়ের বারঘরিয়া গ্রামের আজাদুর রহমান (৫২) বলেন, “ঠান্ডাত কষ্টের আর শ্যাষ নাই। ঠান্ডাত আবাদ সুবাদ সউগ শ্যাষ হয়া যাবার নাগছে! ঠান্ডাত জীবন বাঁচে না, আর কি কাম করমো।”
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ উল্যাহ বলেন, “এখন পর্যন্ত জেলায় পাঁচটি উপজেলায় ২৪ হাজার কম্বল বিতরণের জন্য পাঠানো হয়েছে। সেগুলো বিতরণ কার্যক্রম চলমান আছে। আরও শীতবস্ত্রের চাহিদা পাঠানো হয়েছে।”
রংপুর: রংপুর আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শনিবার জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এ রংপুর ছাড়াও বিভাগের সৈয়দপুর, তেঁতুলিয়া দিনাজপুরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ চলছে। একই সঙ্গে স্থানভেদে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা বিরাজ করছে।
আরও কমপক্ষে ২ দিন এমন তাপমাত্রা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
আগামী ১৬ জানুয়ারি থেকে মেঘের আনাগোনার সঙ্গে সঙ্গে হালকা বৃষ্টি হতে পারে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
জেলায় ভোর আর সন্ধ্যায় গ্রামে গ্রামে জটলা বেঁধে আগুন পোহানোর মাধ্যমে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে অনেকেই। শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুনের উষ্ণতা নিতে গিয়ে কোথাও কোথাও ঘটছে অগ্নিদগ্ধের ঘটনাও।
কেউ কেউ শীত নিবারণে গরম পানি ব্যবহার করতে গিয়েও দগ্ধ হচ্ছেন।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২ দিনের ব্যবধানে অগ্নিদগ্ধ হয়ে ৪৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। দগ্ধ রোগীদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু।
এদের মধ্যে বার্ন ইউনিটে ১৩ জন এবং বাকি ৩২ জনকে সার্জারি, শিশু ও মহিলা ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. শাহ মো. আল মুকিত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, চিকিৎসাধীন বেশির ভাগ রোগীই শীতের তীব্রতা থেকে উষ্ণতা পেতে আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হয়েছেন। প্রতি শীত মৌসুমে রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় অগ্নিদগ্ধের এমন ঘটনা ঘটে।
বর্তমানে বার্ন ইউনিটসহ হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রংপুরের বাইরে বিশেষ করে দিনাজপুর, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁওয়ে এই অগ্নিদগ্ধের ঘটনা বেশি ঘটছে।
এছাড়া, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় শীত নিবারণের জন্য আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হওয়া এক বৃদ্ধা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
ঠাকুরগাঁও: উত্তরের এই জেলায় অব্যাহত রয়েছে শীতের তীব্রতা। ঘন কুয়াশার সঙ্গে হিমেল বাতাসে বেড়েছে ঠান্ডা। আর এই ঠান্ডায় সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছে ছিন্নমূল মানুষেরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, শনিবার সকাল ৬টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
“এটিই চলতি শীত মৌসুমে জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ।”
তিনি বলেন, “ঘন কুয়াশায় ধানে বীজতলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে; আমাদের কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে গিয়ে কৃষকদের নানা ধরনের পরামর্শ দিয়ে আসছে বীজতলা রক্ষার জন্য।”
অব্যাহত শৈত্যপ্রবাহে নিম্ন আয়ের মানুষদের জীবনযাত্রা থমকে গেছে। কাজকর্মে গতি কমে যাওয়ায় অনেকের রোজগার কমে গেছে।
জেলা শহরের মুন্সিপাড়া এলাকার রিকশাচালক আবু মণ্ডল বলেন, আগে ভোর বেলা রিকশা নিয়ে বের হতাম। এখন শীতে ভোরে রিকশা বের করতে পারছি না। অন্যদিকে রিকশায় ঠান্ডা বেশি লাগায় যাত্রীও কম পাচ্ছি। এ কারণে আয়-রোজগার কমে গেছে।
সদরের জগন্নাথপুর ইউনিয়নের খোচাবাড়ি এলাকা থেকে জেলা শহরের চৌরাস্তায় কাজের অপেক্ষায় থাকা দিনমজুর নজরুল ইসলাম বলেন, “ঘন কুয়াশা ও ঠান্ডার তানে ৫ দিন ধরে কুন কাজ পাউনি। ঠান্ডার তানে আয় রোজগারও কমে গেইছে। স্ত্রী, ছুয়া নিয়া কষ্টে দিন যাছে।”
শহরের বাসস্ট্যান্ডে এলাকার ট্রাক চালক আরিফ হোসেন বলেন, অন্যান্য বছরের তুলতায় এবার ঠাকুরগাঁওয়ে শীতের তীব্রতা অনেক বেশি; সঙ্গে ঠান্ডা হাওয়া। ঘন কুয়াশায় দিনের বেলায় হেডলাইট জ্বালিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। শীতে গাড়ি চালানো কষ্টকর হয়ে গেছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, জেলায় শীতের তীব্রতা অনেক বেশি। সরকার থেকে পাওয়া ৩৬ হাজার কম্বল বিতরণ করা হচ্ছে। কম্বলের চাহিদা আরও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বার্তা পাঠানো হয়েছে।
Source by>>https://bangla.bdnews24.com/samagrabangladesh/b4j1kziprx